চট্টগ্রামে বাড়ছে এইডস রোগী, ‘বেশিরভাগ প্রবাসী’

চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রাণঘাতী এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, যাদের অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী ও তাদের স্বজন বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
তাদের ভাষ্য মতে, প্রবাসে অবস্থানরতদের ঝুঁকিপূর্ণ যৌন সম্পর্ক বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান না থাকা এবং বিদেশে যাওয়ার আগে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং না হওয়ায় এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। বিদেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশে ফেরা ব্যক্তিদের মাধ্যমে তাদের স্ত্রী ও সন্তানরাও এতে আক্রান্ত হচ্ছেন।

এইচআইভি ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের অ্যান্টি রেট্রো ভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সেন্টার।

এ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে এ বছর নতুন করে এইচআইভি ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৭১ জন। এর মধ্যে ৪৪ জন পুরুষ, ১৮ জন নারী এবং নয়টি শিশু। এই ১১ মাসে এই রোগে মারা গেছেন ১০ জন। তাদের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ, চারজন নারী ও একটি শিশু।

এছাড়া নতুনদের নিয়ে এ বছর চট্টগ্রাম অঞ্চলে এইচআইভি আক্রান্ত মোট রোগীর সংখ্যা ৪২১ জন। এদের মধ্যে তাদের কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩২৬ জন।

২০১৮ সালে চট্টগ্রাম অঞ্চলে নতুন করে এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৪৫ জন। ওই বছর সারা দেশে নতুন করে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৮৭৯ জন।

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি
১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে প্রথম এইডস রোগী শনাক্তের পর থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ছয় হাজার ৪৫৫ জন এতে আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে মারা গেছেন এক হাজার ৭২ জন। এর মধ্যে ২০১৮ সালেই মৃত্যু হয়েছে ১৪৮ জনের।

চট্টগ্রাম মেডিকেলের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের চিকিৎসক এবং এআরটি সেন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডা. সঞ্জয় প্রসাদ দাশ বিডিনিউজ টোয়ন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চট্টগ্রামের এইচআইভি ভাইরাস আক্রান্তদের একটি বড় অংশ প্রবাসী। এদের অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছিলেন। অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক বা অন্যান্য কারণে তারা এ ভাইরাসের জীবাণু বহন করে আনছেন, এদের মাধ্যমেই তাদের স্ত্রীর মধ্যে সংক্রমিত হচ্ছে।

“স্ত্রী এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সন্তানের মধ্যে সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারে অথবা মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমেও এটি সংক্রমিত হতে পারে।”

এইডস নিয়ে কাজ করা এই হাসপাতালের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক এ কিউ এম সিরাজুল ইসলামও প্রবাসীদের মধ্যে এইচআইভি আক্রান্তের হার বেশি পাওয়ার কথা জানান।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শুধু হাসপাতালে নয়, ব্যক্তিগতভাবে এইডসের চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের মধ্যেও প্রবাসীর সংখ্যা বেশি।

“প্রবাসীরা বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যাওয়া কর্মীরা দীর্ঘদিন তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। তারা বিদেশে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণে জড়িয়ে পড়ে। সেক্সুয়াল প্রটেকশন বা এইচআইভি ভাইরাস সম্পর্কিত ধারণা তাদের মধ্যে না থাকায় এ ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে নিজের অজান্তেই এ ভাইরাসের জীবাণু বহন করে।”

মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে যাওয়ার আগে তাদের এইচআইভি ভাইরাস ও এইডস নিয়ে কাউন্সেলিং করা গেলে আক্রান্ত হওয়ার হার অনেক কমে আসবে মনে করেন ডা. সিরাজুল ইসলাম।

এছাড়া দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান না করে নির্দিষ্ট সময় পরপর দেশে এসে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থাকার মানসিকতা তৈরি করতে পারলেও এই রোগে আক্রান্তের হার কমবে বলে মনে করেন তিনি।

এই চিকিৎসক বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ভাইরাস সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা অনেক বেড়েছে। আক্রান্ত রোগীরাও আগের চেয়ে বেশি সংখ্যায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন এবং এ রোগের প্রতিষেধক নিচ্ছেন।

চট্টগ্রাম মেডিকেলের প্রিভেনশন অব মাদার টু চাইল্ড ট্রান্সমিশন (পিএমটিসিটি) প্রোগ্রামের আওতায় গর্ভবতী মায়েদের এইচআইভি ভাইরাস শনাক্তকরণের পরীক্ষা করা হয়। সম্প্রতি চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল এবং সিটি করপোরেশন পরিচালিত মেমন মাতৃসদন হাসপাতালেও এ কর্মসূচি চালু হয়েছে।

মা থেকে শিশুতে এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধ কার্যক্রমের চট্টগ্রামের ম্যানেজার আলী হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, পরীক্ষার মাধ্যমে এইচআইভি আক্রান্ত রোগী যেমন শনাক্ত করা যাচ্ছে তেমনি সচেতনতাও বাড়ছে।

“এইডস নিয়ে সচেতনতা আরও বাড়াতে বিশেষ করে মা থেকে সন্তানদের মধ্যে সংক্রমণ রোধের জন্য চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও এ কার্যক্রম চালু করা জরুরি।”

Related posts