জেলা ছাত্রলীগের ১ বছর মেয়াদী কমিটি পা রেখেছে ৪ বছরে

ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন চাঁদপুর জেলা ছাত্রলীগের ১ বছর মেয়াদী কমিটি পা রেখেছে ৪ বছরে। দলের গঠনতন্ত্রে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, জেলা কমিটির মেয়াদকাল হবে ১ বছর। অথচ নিজ দলের গঠনতন্ত্র মানছেন না নিজেরাই।

জানা যায়, ২০১৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকিরের নেতৃত্বাধীন কমিটি যৌথ স্বাক্ষরে চাঁদপুর জেলা ছাত্রলীগের সুপার এইট বা ৮ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা দেয়। এ কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে ২ জনের নাম রাখা হয়। দ্বিতীয় নাম মোস্তফা কামাল সুজনকে নিয়ে স্বয়ং দলের তৃণমূল থেকে আপত্তি উঠে। তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী জামাত-শিবিরের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততা এবং দলীয় কার্যক্রমে তার উপস্থিতি ছিলো এমন নজির নেই অভিযোগ উত্থাপিত হলে বিব্রত হয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি তাৎক্ষণিক তদন্ত সাপেক্ষে তাকে বহিষ্কার করে। কমিটির বাকি ৭ জন হচ্ছেন : সভাপতি আতাউর রহমান পারভেজ, সাধারণ সম্পাদক পারভেজ করিম বাবু, সিনিয়র সহ-সভাপতি তৌহিদুল ইসলাম মিলন, সহ-সভাপতি মোঃ হাসিব পাটোয়ারী, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল হাসান মুন্না, যুগ্ম সম্পাদক জহির উদ্দিন মিজি ও সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ আশরাফুল হোসেন।

জানা যায়, পূর্বে জেলা ছাত্রলীগের অধীনস্থ ইউনিট ছিলো ১৭টি। দেশের সকল উপজেলায় ১টি কলেজকে সরকারিকরণের কারণে এ কলেজগুলোকে উপজেলা কমিটির মর্যাদা দেয়ায় জেলায় ইউনিট সংখ্যা বেড়ে ১৭ থেকে ২৫টি হয়েছে। এগুলো হচ্ছে : ৮টি উপজেলা, ৭টি পৌরসভা ও ৮টি সরকারি কলেজ। এ ইউনিটগুলোর সব ক’টিতে কমিটি রয়েছে। কিন্তু কমিটিগুলোর অধিকাংশ আংশিক এবং মেয়াদোত্তীর্ণ। আবার এ ইউনিটগুলোর কবে মেয়াদকাল শেষ হয়েছে বা কত দিন মেয়াদ রয়েছে তা স্বয়ং জেলা ছাত্রলীগ বলতে পারছে না। জেলা ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটি দীর্ঘ ৪ বছরে কচুয়া ও শাহরাস্তি উপজেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ আংশিক কমিটি ঘোষণা দেয়। অনেক তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও এ উপজেলাগুলো পূর্র্র্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা জমা না দেয়ায় বর্তমান কমিটি একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেয়ার সৌভাগ্য হয়নি। অপরদিকে স্থানীয় এমপিরা প্রভাব খাটিয়ে কেন্দ্র থেকে তাদের নিজ উপজেলা কমিটি আংশিক ঘোষণা এনেছেন। এমন ৩টি কমিটি হলো : মতলব উত্তর, মতলব দক্ষিণ উপজেলা এবং ফরিদগঞ্জ উপজেলা।

আবার জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শেখ আবদুল মোতালেব ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুর রহমান তৃপ্তির নেতৃত্বাধীন কমিটি যৌথ স্বাক্ষরে হাজীগঞ্জ উপজেলা ও পৌর আংশিক কমিটি অনুমোদন দিলেও আজও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। জেলা ছাত্রলীগের ইতিহাসে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে পূর্ব থেকে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব পরবর্তীতে ভাগ্যের কারণে এরা দুজন একই সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব পাওয়া, তাও সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব-এটি ছিলো প্রথম। এরা হলেন সভাপতি আঃ মোতালেব শেখ ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়েদুর রহমান তৃপ্তি। কমিটি ঘোষণার পর দীর্ঘদিন ঐক্য থাকলেও হঠাৎ করে গ্রুপিংয়ের কারণে আলাদা দুটি মেরুতে অবস্থান হয় দুজনের। এ অবস্থায় সভাপতি শেখ আঃ মোতালেব চাঁদপুর পৌর ছাত্রলীগের কমিটি একক স্বাক্ষরে অনুমোদন দেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এ কমিটি অনুমোদন দেয়া হয় বর্তমানে চলমান কমিটি ঘোষণার ৩ দিন পূর্বের তারিখ দিয়ে। অবশ্য এর পূর্বে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়েদুর রহমান তৃপ্তিও তার একক স্বাক্ষরে চাঁদপুর সরকারি বিশ^বিদ্যালয় কলেজ কমিটি অনুমোদন দেয়ায় তাদের মধ্যে আরো দূরত্ব সৃষ্টি হয়। অবশ্য ঘোষণা করা এ দুটি কমিটি নিয়ে রয়েছে বিতর্ক।

এছাড়া উল্লেখিত ইউনিটগুলোর মধ্যে কিছু ইউনিট বর্তমান ফরিদগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম রোমান ও সাধারণ সম্পাদক সায়েদুর রহমান অপুর নেতৃত্বাধীন কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত। আর উপজেলাগুলোতে নতুন সরকারি কলেজগুলোর কমিটি গুলো স্ব স্ব উপজেলা কমিটি করেছে বলে জানা গেছে। যার ফলে দেখা যায়, জেলা ছাত্রলীগের অধীনস্থ ইউনিটগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় সাংগঠনিক কাযক্রম চলছে। আর এ ইউনিটগুলো কবে হয়েছে, মেয়াদ কবে শেষ হয়েছে, কবে নাগাদ হবে তা স্বয়ং দায়িত্বশীলরা বলতে পারছেন না। অপরদিকে জেলা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি কবে নাগাদ হচ্ছে তা নিয়ে সন্দিহান রয়েছেন ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। এভাবে এক পদে এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন যাবৎ নেতৃত্বে থাকার কারণে হতাশায় ভুগছেন পদ-পদবী প্রত্যাশী নেতা-কমীরা। ইতিমধ্যে পদ-পদবীর আশায় থাকা অনেকে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন। আবার নতুন প্রজন্মের ছাত্ররা এই অবস্থা দেখে হতাশায় আক্ষেপ করেছেন। কারণ ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী ছাড়া অন্য কেউ ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিতে পারবে না; বয়সের নির্ধারিত সময়সীমা থাকায় এ হতাশা বিরাজ করছে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে ছাত্রলীগকে ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের মর্যাদা দেয়া রয়েছে। অথচ কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে থাকা নেতৃবৃন্দ কাজ করায় তাদের মেয়াদকাল পেরিয়ে বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও যোগ্য নেতৃত্বের বিকাশ ঘটছে না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক ছাত্র নেতৃবৃন্দ। শুধু তাই নয়, অন্তঃকোন্দলে জড়িয়ে পড়ছে ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ। এ কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও যোগ্য নেতৃত্বকে নেতৃত্বে বসানো এবং মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরও নতুন কমিটি ঘোষণা বা সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠন সুদূর পরাহত হয়ে গেছে।

সাবেক নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, এক সময় কোনো কমিটির মেয়াদ শেষ হলে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সম্মেলনের তারিখ দিয়ে এসে সম্মেলন করে বিভিন্ন পদের প্রার্থীদের কাউন্সিলরদের গোপন ভোটে নির্বাচিত করতেন এবং নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা দিতেন। এখন চাটুকারিতাকে প্রাধান্য দেয়ায় কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে কমিটি ঘোষণা দেয়ায় নেতৃত্বের বিকাশ না হয়ে ছাত্র রাজনীতি কলঙ্কিত হচ্ছে।

এসব উল্লেখিত অভিযোগের মতো চাঁদপুর জেলা ছাত্রলীগের চলমান কমিটির দু’শীর্ষ নেতার অন্তঃকোন্দলের কারণে দু’জন দুটি ধারায় অবস্থান করায় জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমে সফলতা পাচ্ছে না বলে অভিমত সাবেক ছাত্র নেতাদের। নেতৃত্বের কোন্দলের কারণে সকল ইউনিটকে শক্তিশালী ও সমন্বয় করে জেলা কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ নেতা-কর্মীদের।

এ সকল বিষয়ে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মোঃ আতাউর রহমান পারভেজের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি দলীয় কোন্দল বিষয়ে সরাসরি স্বীকার না করে দলীয় বিভিন্ন কার্যক্রমের সফলতার কথা তুলে ধরে বলেন, ছাত্রলীগের সক্রিয়তার কারণে শিক্ষা ক্ষেত্রে আজ আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। তিনি দলীয় কার্যক্রমে ব্যস্ততাহেতু এতোদিন কমিটি করা যায়নি এবং সিনিয়র নেতৃবৃন্দের মতামতের ভিত্তিতে খুব সহসাই কমিটি করা হবে বলে জানান। এর বাইরে তিনি কিছু বলতে পারবেন না বলে জানান।

জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পারভেজ করীম বাবুর সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি স্থানীয় সিনিয়র নেতৃবৃন্দের কোন্দল ও অসহযোগিতার কথা কিছুটা স্বীকার করে বলেন, কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে পূর্ণাঙ্গ কমিটির বিষয়ে তাগাদা দেয়ার কারণে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দেয়া হয়েছে। তবে সভাপতি কমিটি জমা দিলে উভয়ের সাথে সমন্বয় করে খুব সহসাই পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করার আশ^াস দেন তিনি। এর বাইরে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

জানা যায়, ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জেলা ছাত্রলীগের কমিটির মেয়াদ এক বছর এবং তার অধীনস্থ কমিটিগুলোও এক বছর মেয়াদী। জেলা কমিটির সদস্য সংখ্যা ১২১ সদস্যবিশিষ্ট হবার নিয়ম রয়েছে। বিশেষ কোনো ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমতি নিয়ে সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির নিয়ম রয়েছে।

জানা যায়, সর্বশেষ ২০০৩ সালে চাঁদপুর হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনেকটা উৎসবমুখর পরিবেশে চাঁদপুর জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলন হয়। এরপর সম্মেলনবিহীন এ পর্যন্ত ছাত্রলীগের ২টি কমিটি কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে ঘোষণা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক মুশফিকুল আলম রেজার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে চাঁদপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অপেক্ষা করেন, সহসাই ভালো ফলাফল আসবে।

Related posts