করোনা ভাইরাসে গ্রামাঞ্চল সম্পূর্ণ অরক্ষিত

বিশ্বজুড়ে মহামারী আতঙ্ক ‘করোনা ভাইরাসে’র সংক্রমণ থেকে রক্ষার জন্যে সরকারের যে নির্দেশনা রয়েছে তার কোনো ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না গ্রামাঞ্চলে। গ্রামে যেনো উৎসব চলছে। করোনা ভাইরাসের আতঙ্ককে গ্রামের লোকজন যেনো আমলেই নিচ্ছে না। ঈদ বা বিভিন্ন দিবসের লম্বা ছুটিতে মানুষ গ্রামের বাড়িতে এসে যেমন আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠে, বাজার, চায়ের দোকানে আড্ডা জমে যায়, ফুটবল, ক্রিকেটসহ নানা খেলাধুলা করে থাকে দল বেঁধে, ঠিক তেমনই দৃশ্য এখন গ্রাম-গঞ্জে। অথচ সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতসহ সব কিছু বন্ধ দিয়েছে মানুষ যাতে নিজ নিজ বাসা-বাড়িতে অবস্থান করে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে নিজেকে এবং সমাজকে মুক্ত রাখে। কিন্তু মানুষ দীর্ঘ ছুটি পেয়ে গ্রামের বাড়িতে এসে আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠেছে।

মরণব্যাধি করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে দেখা দেয় মার্চ মাসের প্রথম দিক থেকে। বিশে^র বিভিন্ন দেশে যখন এর আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে, এক পর্যায়ে মহামারীতে রূপ নেয়, তখন বাংলাদেশ সরকারও এটিকে খুব সিরিয়াসভাবে নেয়। শুরু হয় বিদেশফেরতদের উপর কঠোর নজরদারি। এদেরকে শুরুর দিকে বিমানবন্দরে আটকে দিয়ে হজ্ব ক্যাম্পে ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টাইনে তথা একাকিত্বে থাকার উদ্যোগ নেয়া হয় সরকার থেকে। যদিও এটি করতে গিয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে খুব বেকায়দায় পড়তে হয়। অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়। একই সাথে শুরু হয় জেলায় জেলায় বিদেশফেরতদের সন্ধান অভিযান। বিদেশ থেকে যারা এসেছে, তাদেরকে নিজ নিজ ঘরে ১৪ দিন একাকি থাকতে (হোম কোয়ারেন্টাইনে) বাধ্য করা হয়। স্বাস্থ্য বিভাগ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখে। শুরুর দিকে চাঁদপুর জেলায় হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায়। পরে আস্তে আস্তে কমতে থাকে। গতকাল এই সংখ্যা ছিলো ৮২ জন। অবশ্য সরকার থেকেও বিভিন্ন দেশের ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়া হয়।

এদিকে সরকার এর ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। কিন্তু এ ছুটি পেয়ে মানুষ পঙ্গপালের ন্যায় গ্রামের দিকে ছুটতে থাকে। অথচ সরকার এরই মধ্যে সব ধরনের সভা-সমাবেশ, জমায়েত নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সাধারণ সভা-সমাবেশ, ধর্মীয় সভা তো বটেই, এমনকি ১৭ মার্চ জাতীয় শিশু দিবস এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকীর সব ধরনের জনসমাগম অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়। একইভাবে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের সব ধরনের অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়। যা স্বাধীনতার ৪৯ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম। এদিকে ২৪ মার্চ থেকে চাঁদপুরের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হার্ডলাইনে চলে যায়। এদিন সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের নির্দেশনা আসার সাথে সাথে চাঁদপুর শহরে পুলিশ সাঁড়াশি অভিযানে নামে। বন্ধ করে দেয়া হয় সব হোটেল রেস্তোরাঁ, দোকানপাট, মার্কেটসহ জনসমাগম হতে পারে এমন সব ধরনের স্পট। সকল ধরনের বিনোদন স্পটও বন্ধ করে দেয়া হয়।

২৪ মার্চ থেকে মাঠ পর্যায়ে সেনাবাহিনী নামানো হয় সিভিল প্রশাসনকে সহযোগিতা করার জন্যে। বলতে গেলে অঘোষিত কারফিউ জারি হয়ে যায়। ২৪ মার্চ সন্ধ্যার পর থেকে পুরো শহর খালি হয়ে যায়। যানবাহন ও জনমানবশূন্য হয়ে যায় চাঁদপুর শহরসহ সকল উপজেলা শহর। পরদিন ২৫ মার্চ যেনো নজিরবিহীন হরতালে রূপ নেয় শহর। লোকজন বলতে থাকে এটি করোনার হরতাল। ২৪ মার্চ থেকে সব ধরনের লঞ্চ এবং ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয় এবং ২৫ মার্চ থেকে গণপরিবহন তথা বাস চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। চাঁদপুর শহর দিনে-রাতে ভুতুড়ে শহরে পরিণত হয়। শহরে কোনো মানুষ অতীব প্রয়োজন ছাড়া বের হলে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃদু শাস্তিও দেয়া হয়েছে কাউকে কাউকে পরিস্থিতি অনুকূলে রাখার জন্যে। অথচ এই সময়গুলোতে গ্রামের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গ্রামের মানুষগুলোর মধ্যে যেনো করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কোনো ভয়ভীতি নেই। তারা দিব্বি আড্ডা দিচ্ছে চায়ের দোকানে, বাজারে এবং খোলা জায়গায়। অর্থাৎ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার যে বিষয়টি রয়েছে, এর কোনো ছিটেফোঁটাও নেই। এমনকি কারো মুখে মাস্ক লাগানো নেই, হ্যান্ড স্যানিটাইজার দূরে থাক, সাবান দিয়ে হাত ধোয়ারও যেনো প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা অন্যান্য কোনো সংস্থা গ্রামের দিকে যেনো কোনো নজরই দিচ্ছে না। এমতাবস্থায় গ্রামের সচেতন মানুষগুলো খুব আতঙ্কের মধ্যে আছে, যদি কাউকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত করে ফেলে, তখন তো আর নিস্তার নেই। পরিস্থিতি তখন সামাল দেয়াটাই কঠিন হয়ে যাবে। তাই গ্রামের দিকে নজর দিতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।

Related posts